"রমেন্দ্র গোস্বামীঃ পৌষ সংক্রান্তি মানেই শীতের হালকা রোদ, নতুন ধানের ঘ্রাণ আর গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকাচারের পুনর্জাগরণ। আধুনিকতার দাপটে যেখানে শৈশবের খেলাধুলা আর গ্রামীণ উৎসব ক্রমশ স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে, ঠিক সেখানেই আশার আলো জ্বালায় খড় দিয়ে বানানো ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়ির ঘর’। সংক্রান্তির প্রাক্কালে এই বুড়ির ঘর যেন শুধু একটি ঘর নয়—এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, শৈশবের নির্মল আনন্দ আর সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন থেকেই গ্রামগুলিতে শুরু হয় বুড়ির ঘর বানানোর তোড়জোড়। বাঁশ, খড়, শুকনো পাতা, মাটি আর রঙিন কাগজ—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে ছোট্ট একটি ঘর। কোনো পাকা নকশা নয়, কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ও নয়—শুধুই সম্মিলিত শ্রম আর সৃষ্টিশীলতা। গ্রামের শিশু- কিশোর থেকে শুরু করে যুবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এই ঘর নির্মাণ হয়ে ওঠে এক সামাজিক উৎসব।স্থানীয় প্রবীণদের কথায়, বহু প্রাচীনকাল থেকেই পৌষ সংক্রান্তির সঙ্গে বুড়ির ঘরের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে। কৃষিভিত্তিক সমাজে নতুন ফসল ঘরে ওঠার আনন্দকে কেন্দ্র করেই এই লোকাচারের জন্ম। বুড়ির ঘর মূলত প্রতীকী—কখনো তা শস্যদেবীর আশ্রয়, কখনো বা গ্রামীণ জীবনের সরলতার প্রতিচ্ছবি। সংক্রান্তির সকালে ঘর সাজিয়ে তোলা হয় আলপনা, খড়ের পুতুল, মাটির হাঁড়ি আর গ্রামীণ অলঙ্করণে। কোথাও কোথাও দেখা যায় লোকজ শিল্পের ছোঁয়া—ঢেঁকি, গোলা, নবান্নের উপকরণ দিয়ে সাজানো বুড়ির ঘর।এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শিশুদের অংশগ্রহণ। খড় কেটে আনা, বাঁশ বেঁধে দেওয়া, ঘর সাজানো—সব কাজে তাদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। স্মার্টফোন আর অনলাইন গেমের যুগে দাঁড়িয়ে বুড়ির ঘর নির্মাণ যেন শিশুদের হারানো শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মাঠে-ঘাটে দৌড়ঝাঁপ, দল বেঁধে কাজ করার আনন্দ, বড়দের কাছ থেকে গল্প শোনা—এসবই তাদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা।শুধু নির্মাণেই শেষ নয়, সংক্রান্তির দিন বুড়ির ঘরকে কেন্দ্র করে বসে ছোটখাটো মেলা। কোথাও পিঠে-পুলি, মুড়ি-মুড়কি আর গুড়ের মিষ্টি; কোথাও আবার লোকগান, ছড়া, খেলাধুলা। প্রবীণরা শোনান পুরনো দিনের সংক্রান্তির গল্প—কেমন ছিল গ্রামীণ জীবন, কীভাবে একসময় গোটা পাড়া মিলে উৎসব পালন করা হতো। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে সংস্কৃতির উত্তরাধিকার।বর্তমান সময়ে যখন গ্রামীণ লোকাচার হারিয়ে যাওয়ার মুখে, তখন বুড়ির ঘর নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক এলাকায় যুবসমাজ নিজেরাই উদ্যোগ নিচ্ছে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় আগ্রহ বাড়ছে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও। কেউ কেউ বুড়ির ঘরকে উপজাতীয় ঢংয়ে সাজিয়ে তুলছে, আবার কেউ লোকজ থিমে তুলে ধরছে গ্রামীণ জীবনের গল্প।সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, বুড়ির ঘর শুধু একটি লোকাচার নয়, এটি গ্রামীণ সমাজের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। সম্মিলিত শ্রম, পারস্পরিক সহযোগিতা আর উৎসবের আনন্দ—সব মিলিয়ে এটি এক অনন্য সামাজিক অনুশীলন। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে দলগত কাজ, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতিবোধ গড়ে ওঠে।পৌষ সংক্রান্তির সকালে খড়ের গন্ধ আর রোদ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ির ঘর যেন নীরবে বলে যায়—সময় বদলালেও শিকড় ভুললে চলবে না। এই ঘরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হারানো শৈশবের হাসি, গ্রামীণ জীবনের সরলতা আর বাঙালির চিরন্তন লোকসংস্কৃতি। তাই সংক্রান্তির আমেজে খড় দিয়ে বানানো এই ছোট্ট ঘর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখাই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে শক্ত ভিত।